৯ই আগস্ট, ২০২০ ইং, রবিবার

জাপান টাইমসে শেখ হাসিনার নিবন্ধ : উন্নয়নে জাপান-বাংলাদেশ অংশীদারিত্ব

আপডেট: মে ৩০, ২০১৯

| মেহেদী হাসান রাসেল

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

গত এক দশকে বাংলাদেশের যে বিস্ময়কর আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটেছে, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলেও তা অলৌকিক বলে আখ্যা পাচ্ছে। আমাদের এ অলৌকিক অর্জনের চাবিকাঠি হলো, ‘কাউকে পেছনে ফেলে যাওয়া নয়’—এ নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা গণমুখী এক উন্নয়ন মডেল। গত দশকে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল সাড়ে ৬ শতাংশ হারে। চলতি বছর তা ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। শিগগিরই তা দুই ডিজিটে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।

‘ভিশন ২০২১’-এর সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে আমরা এখন ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়েছি। এ লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রে আমাদের অন্যতম প্রধান উপায় হলো, আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের জন্য মূল্যবান মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা। জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা বড় ধরনের অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। আমরা ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছি, যার একটি স্থাপন করা হচ্ছে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য।

পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে জাপান ও বাংলাদেশ সব সময়ই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় জাপানি শিক্ষার্থীরা তাদের খাওয়ার খরচ বাঁচিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে আমাদের প্রথম স্বীকৃতি দেয়া দেশগুলোর অন্যতম হয়ে ওঠে জাপান। আমাদের পতাকার মধ্যেও বেশ মিল রয়েছে। আমাদের জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান বলতেন, জাপানের পতাকা তাকে উদীয়মান সূর্যের এবং আমাদের দেশের কথা মনে করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয় আমাদের সবুজ মাঠ ও লাখো প্রাণের আত্মাহুতির মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার কথা। জাপানের কৃষিনির্ভরতা থেকে শিল্পায়নের মধ্যকার রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি অনুসরণের জন্য আমাদের উৎসাহ দিতেন তিনি। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে ঐতিহাসিক সফরের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব আমাদের সম্পর্কের দৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করে যান। ১৯৭৪ সালে রাষ্ট্রপতির অনুরোধে সাড়া দিয়ে যমুনা (বঙ্গবন্ধু) সেতুর পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালায় জাপান। শেখ মুজিবের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ অন্য কোনো ভাষার আগে প্রথম জাপানি ভাষাতেই অনূদিত হয়।

বিরোধী দলে থাকাকালে ১৯৯২ সালে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাপানের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ কাজে লাগাই আমি। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর চলাকালে জাপানের পক্ষ থেকে পদ্মা ও রূপসা সেতু নির্মাণে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। এরই ভিত্তিতে জাপান রূপসা সেতু নির্মাণ করে ও পদ্মা সেতু নিয়ে একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালায়। সে সময় জনগণের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলার তাগিদ থেকে পার্লামেন্টারিয়ান ও ফ্রেন্ডশিপ কমিটিও গঠন করা হয়।

১৯৭২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত জাপানের কাছ থেকে উন্নয়ন সহযোগিতা বাবদ আনুষ্ঠানিকভাবে ১ হাজার ১৩০ কোটি ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে আমাদের বৃহত্তম দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন অংশীদার হয়ে উঠেছে জাপান। কর্ণফুলী সার কারখানা, প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেল ও বড় বড় শহরগুলোর পানি সরবরাহ ব্যবস্থাসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে জাপানের অবদান। অন্যদিকে জাপানে অবস্থানরত আমাদের প্রবাসীরাও দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখছেন।

বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে জাপানি উদ্যোক্তাদের আগ্রহ আমাদের সাহসী করে তুলেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ২৮০টি জাপানি প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। গত দশকের তুলনায় এ সংখ্যা বেড়েছে ১০ গুণ। জাপানি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে, দেশে জাপানসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা পরিচালনা নিয়ে আস্থাশীলতার মাত্রা বাড়ছে। দুই সরকারের পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতাধীন ছয় প্রকল্পসহ জাপান-বাংলাদেশ পাবলিক প্রাইভেট ইকোনমিক ডায়লগ চালুর মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যকার ব্যবসায়িক ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদার হয়ে উঠেছে।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল জাপান সরকার। মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগসহ বিভিন্ন জয়েন্ট ভেঞ্চার প্রজেক্টে জাপানি কোম্পানিগুলোর বড় ধরনের উপস্থিতি ও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বাংলাদেশে এখন মধ্যম আয়ের জনগণের সংখ্যা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বাড়ছে, যার ফলে বিনিয়োগকারীদের অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারিংসহ নতুন নতুন ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের একটি অন্যতম পূর্বশর্ত হলো ব্যবসা সহজীকরণের মাত্রা বৃদ্ধি। এজন্য বিনিয়োগকারীদের এক জায়গা থেকেই নানামুখী সেবাদানের প্রয়াস থেকে ২০১৮ সালে ওয়ান স্টপ সার্ভিস অ্যাক্ট চালু করা হয়েছে। এ মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ায় বিনিয়োগের সবচেয়ে উদার ও উপযোগী ক্ষেত্র হলো বাংলাদেশ।

কোনো ধরনের সীমা আরোপ ছাড়াই প্রায় সব খাতে এখন বিদেশী ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো হচ্ছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের এখন বিভিন্ন ধরনের উদার মাত্রার করছাড় ও অন্যান্য আর্থিক প্রণোদনার সুবিধা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে আমাদের ৩২টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। দ্বৈতকর পরিহারের চুক্তি রয়েছে জাপানসহ ২৮টি দেশের সঙ্গে।

আমাদের দীর্ঘমেয়াদে পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার উদ্দেশ্য থেকে ও আমাদের স্বপ্নপূরণের পদক্ষেপ হিসেবে ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’-এর অনুমোদন দিয়েছি আমরা। এটি বাস্তবায়নের জন্য নানামুখী উন্নয়নের পথে উড্ডয়নের ক্ষেত্রে আমাদের মাইলস্টোনগুলো হচ্ছে এজেন্ডা ২০৩০, ভিশন ২০৪১ ও ২০৭১। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে সেবা ও উৎপাদন খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধির পথে রূপান্তর হচ্ছে আমাদের।

পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাই-টেক পার্ক ও আইসিটি পার্কের মতো আমাদের বেশকিছু রূপান্তরমুখী প্রকল্প এখন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে এবং আমরা বিভিন্নমুখী পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বৃহদায়তনের অবকাঠামো উন্নয়ন, আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা ও সর্বোপরি আমাদের জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে আমাদের রূপান্তরমূলক যাত্রার পথে জাপান ও এর জনগণ আমাদের সঙ্গী হবে।

২০১৬ সালের জুলাইয়ে ঢাকায় সন্ত্রাসী হামলার মধ্য দিয়ে আমাদের বন্ধুত্ব পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। ওই ঘটনায় সাত জাপানি নাগরিকের ট্র্যাজিক মৃত্যু ঘটে। জাতীয় পর্যায়ে ওই সময়টা ছিল বেদনার ও শোকের এবং আবারো জাপানের জনগণ ও সরকার আমাদের পাশে দাঁড়ায় এবং বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পুনর্নিশ্চয়তা দেয়। জাপান ও বাংলাদেশ এখন একযোগে সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ মোকাবেলায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

২০২২ সালে আমরা আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পালন করতে যাচ্ছি। শান্তি ও উন্নয়ন বজায় রাখা নিয়ে আমাদের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি ও অঙ্গীকারাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের জনগণের জন্য সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারব বলে আমি বিশ্বাস করি। যে অচ্ছেদ্য বন্ধন আমাদের এক করে রেখেছে, তারই স্মারক আমাদের প্রতিরূপী পতাকা দুটি।

শৈশব থেকেই জাপান নিয়ে আমার মধ্যে এক মুগ্ধতা রয়েছে। জাপানি শিল্প, ক্যালেন্ডার, স্ট্যাম্প, পুতুল ইত্যাদি আমি নিয়মিতই সংগ্রহ করতাম। জাপান সবসময়েই ছিল আমার হূদয়ের কাছাকাছি। আর আমি এটি পেয়েছি আমার বাবার কাছ থেকে। আমার দেশকে আরেক জাপানে রূপান্তরে তার যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, সেই একই আকাঙ্ক্ষা আমারও। আশা ও ঐকতানের এক নবযুগের সূচনা হয়েছে জাপানে। এ নবযুগ আমাদের আরো কাছে নিয়ে আসুক, আরো গভীর বন্ধনে যুক্ত করুক এবং আমাদের সন্তানদের জন্য নিরাপদ ও সমৃদ্ধির এক নতুন বিশ্ব গঠনে ভূমিকা রাখুক।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

সম্পাদক : মোতাহার হোসেন প্রিন্স, প্রকাশক : মেহেদী হাসান রাসেল

ফ্লাটঃ ৪বি, লেভেলঃ ৪, বাড়ীঃ ১৫, রোডঃ ১৪, সেক্টরঃ ১৩, উত্তরা, ঢাকা ১২৩০

ফোন: 01675132946 

E-mail: dailysongjog@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত